গান : মুক্তির মন্দির সোপানতলে
রচয়িতাঃ মোহিনী চৌধুরী
মুক্তির মন্দির সোপানতলে
কত প্রাণ হল বলিদান,
লেখা আছে অশ্রুজলে ।।
কত বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা,
বন্দীশালার ওই শিকল ভাঙ্গা
তাঁরা কি ফিরিবে আজ সু-প্রভাতে,
যত তরুণ অরুণ গেছে অস্তাচলে।।
যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা এখনও জানেন
স্বর্গের চেয়ে প্রিয় জন্মভুমি
এসো স্বদেশ ব্রতের মহা দীক্ষা লভি
সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুমি।
যাঁরা জীর্ণ জাতির বুকে জাগালো আশা,
মৌন মলিন মুখে জোগালো ভাষা
আজি রক্ত কমলে গাঁথা মাল্যখানি
বিজয় লক্ষ্মী দেবে তাঁদেরই গলে।
কবি পরিচিতি: কবি মোহিনী চৌধুরী একজন স্বনামধনা কবি ও গীতিকার। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জন্ম হয়। তিনি পঞ্চাশ-ষাট দশকের বিখ্যাত গীতিকার। শচীনদেব বর্মন, জগন্ময় মিত্র, মীরা দেবরমন, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, ভি. বালসারা, মান্না দে প্রমুখের সুরে ও কণ্ঠে তাঁর গানগুলি আজও বিশেষ জনপ্রিয়। তিনি অনেক দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা রচনা করেছেন এবং সুর দান করেছেন। পাঠাংশের গানটি অত্যন্ত প্রচলিত একটি দেশভক্তির গান।

মর্মার্থ: স্বাধীনতা আন্দোলনে যে সমস্ত বীর বিপ্লবীরা মুক্তিযুদ্ধের মন্দিরের সোপানে প্রাণদান করেছেন, তা সমগ্র ভারতবাসীর মনে অশ্রুজলে লেখা রয়েছে। দেশের এই মহান সুপ্রভাতে তাঁরা আর ফিরবেন না। অনেক বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙিয়ে বন্দিশালার ওই শিকল ভাঙা হয়েছে। কত তরুণ সূর্যের মতো প্রাণ অস্ত গেছে। যারা স্বর্গে গেছেন তাঁরা জানেন স্বর্গের চেয়ে প্রিয় তাঁদের জন্মভূমি। এই দেশকে ভালোবাসার ব্রতে দীক্ষা নিয়ে আমরা সেই মৃত্যুঞ্জয়ীদের চরণ চুম্বন করে প্রণাম জানাই। দেশের জীর্ণ জাতির বুকে আশা ও মুখে ভাষা জাগিয়েছেন যারা, স্বদেশব্রতের দীক্ষালাভ করে আমরা তাদের চরণে জানাই প্রণাম। রক্তকমলে গাঁথা মালা বিজয়লক্ষ্মী তাঁদেরই গলায় পরিয়ে দেবেন। দেশের মহান বিপ্লবীদের প্রতি এটি কবির পরম শ্রদ্ধাঞ্জলি।
ব্যাকরণের প্রশ্নোত্তর:
শব্দার্থ : মন্দির- দেবালয়। সোপান - সিঁড়ি, পাপ। অশ্রু জলে- চোখের জলে। বিপ্লবী—স্বাধীনতা সংগ্রামী! স্বর্গগত যাঁরা- স্বর্গে গেছেন। মৃত্যুঞ্জয়ী—যাঁরা মৃত্যুকে জয় করেছেন। জীর্ণ-শীর্ণ হয়েছে এমন। মৌন—নীরব। মলিন—বিষণ্ণ, ম্লান। রক্তকমল – লালপদ্ম। বিজয় লক্ষী- জয় অধিষ্ঠাত্রী দেবী।
বিপরীত শব্দ
ভাঙা-গড়া। প্রিয়—অপ্রিয়। মুক্তি—বদ্ধন। আশা-নিরাশা। মৌন- মুখর। মলিন- উজ্জ্বল।
বাক্য রচনা করোঃ
মন্দির – গঙ্গার তীরে তীরে বহু মন্দির দেখা যায়।
বলিদান— স্বাধীনতা সংগ্রামীরা দেশের জন্য প্রাণ বলিদান করেছেন।
বিপ্লবী— ইংরেজ আমলে বহু বিপ্লবী শহিদ হয়েছেন।
শিকল— পশুপাখিদের খাঁচায় শিকল বেঁধে রাখা হয়। অস্তাচলে - সূর্য অস্তাচলে গেল, রাত্রি নামল।
জন্মভূমি- জন্মভূমি আমাদের মায়ের সমান। জীর্ণ- গ্রামের জমিদার বাড়িটি অত্যন্ত জীর্ণ হয়ে পড়ে আছে।
মৌখিক প্রশ্ন ও উত্তর :
১. অশ্রুজলে কী লেখা আছে?
উঃ। মুক্তির মন্দিরের সোম্পানে কত প্রাণ বলিদান হয়েছে তা দেশবাসীর হৃদয়ে অশ্রুজলে লেখা আছে।
২. বদিশালার শিকল কীভাবে ভেঙেছে?
উঃ। অনেক বিপ্লবী বন্ধুর রক্তে রাঙা হয়ে বন্দিশালার শিকল ভেঙেছে।
৩. যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা কী জানেন?
উঃ। যাঁরা স্বর্গগত তাঁরা জানেন যে স্বর্গের চেয়ে প্রিয় এই জন্মভূমি।
৪. মৃত্যুঞ্জয়ী কারা?
উঃ। যেসব মহান বিপ্লবীরা দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নিজের প্রাণ উৎসর্গ করেছেন কবি তাঁদের মৃত্যুঞ্জয়ী বলেছেন।
৫. এই মৃত্যুঞ্জয়ীরা জাতিকে কী দিয়েছেন?
উঃ। এই মৃত্যুঞ্জয়ী জীর্ণ জাতির বুঝে আশা ও মলিন মুখে ভাষা জাগিয়েছেন।
৬. কে কী দিয়ে গাঁথা মালা তাঁদের গলায় পরিয়ে দেবে?
উঃ বিজয়লক্ষী রক্তকমলে গাঁথা মালা তাদের গলায় পরিয়ে দেবে।
৭. আমরা কোন ব্রতে মহাদীক্ষা লাভ করি? উঃ। আমরা স্বদেশব্রতে মহাদীক্ষা লাভ করি।
৮. 'তারা কি ফিরিবে আর সুপ্রভাতে-কাদের কথা বলা হচ্ছে?
উঃ। দেশের স্বাধীনতার সুপ্রভাতে যে সমস্ত তরুণ বিপ্লবী অন্তচলে গেছেন অর্থাৎ প্রাণ বলিদান করে শহিদ হয়েছেন সেই সব মহান বিপ্লবীদের কথা কবি বলেছেন।
মন্তব্যসমূহ