গান : চল্ চল্ চল্
রচয়িতা : কাজী নজরুল ইসলাম
চল্ চল্ চল্।
ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল,
নিম্নে উতলা ধরণী-তল,
অরুণ প্রাতের তরুণ-দল
চলের চলের চল্
চল্ চল্ চল্।
ঊষার দুয়ারে হানি’ আঘাত
আমরা আনিব রাঙা প্রভাত,
আমরা টুটাব তিমির রাত
বাধার বিন্ধ্যাচল।
নব নবীনের গাহিয়া গান
সজীব করিব মহাশ্মশান,
আমরা দানির নতুন প্রাণ
বাহুতে নবীন বল।
চলের নৌ-জোয়ান,
শোনরে পাতিয়া কান
মৃত্যু-তোরণ দুয়ারে দুয়ারে
জীবনের আহ্বান।
কবি পরিচিতি: বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম ১৮৯৯ সালে বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বহু দেশাত্মবোধক গান ও কবিতা তিনি রচনা করেন। তাঁর রচিত গান 'নজরুলগীতি' নামে পরিচিত। এই গানটি কবির "সন্ধ্যা" কাব্যগ্রন্থ থেকে নেওয়া। ১৯২৮-এর ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় 'মুসলিম লিটারারি সোসাইটির দ্বিতীয় বার্ষিক আধবেশন উপলক্ষে গানটি রচিত। ১৩ জানুয়ারি ১৯৭২ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার গানটিকে 'জাতীয় সেনা সংগীত' এর মর্যাদা দেন। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের ঢাকায় কবির জীবনাবসান হয়।
মর্মার্থ : বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলাম বহু দেশভক্তির কবিতা ও গান রচনা করেছেন। এইগানটিতে তিনি দেশের তরুণ দলকে এগিয়ে চলতে বলেছেন। রাঙা প্রভাতের দিনে গগনে মাদল বাজাছে, নীচে পৃথিবী উতলা হয়ে উঠেছে। উষার দরজায় আঘাত হেনে এই নব তরুণের দলই রাঙা প্রভাত নিয়ে আসবে। অন্ধকার রাত ঘুচিয়ে, বাধার বিন্ধ্যপর্বত তারা সরিয়ে নেবে। এই শ্মশানভূমির মতো মৃত দেশকে নতুন গান গেয়ে তারা সজীব করে তুলবে। নতুন প্রাণ ও বাহুতে নবীন শক্তি দান করবে। কবি বলছেন নওজোয়ানকে এগিয়ে যেতে, কান পেতে শুনতে মৃত্যুতোরণের দুয়ারে জীবনের আহ্বান শোনা যাচ্ছে। তাই আগল অর্থাৎ বাধা ভেঙে এগিয়ে চলতে হবে।
শব্দার্থঃ ঊর্ধ্ব–উপর। গগনে- আকাশে। মাদল—একধরনের বাদ্য। নিম্নে নীচে। উতলা-ব্যাকুল, অস্থির। ধরণী – পৃথিবী। তরুণ-নবীন। ঊষা—ভোর। টুটাব–ভেঙে ফেলব। তিমির – অন্ধকার। সজীব—জীবন্ত। নৌ-জোয়ান—নব যুবক। দানিব—দান করব। তোরণ – ফটক, প্রবেশদ্বার। আহ্বান–ডাক, আবাহন। আগল—বাধা।
বিপরীত শব্দ: ঊর্ধ্ব–নিম্ন। আঘাত—প্রত্যাঘাত। প্রভাত—নিশা। সজীব—নির্জীব। নবীন-প্রবীণ। মৃত্যু জন্ম।
বাক্য রচনা করো :
মাদল— সাঁওতালরা মাদল বাজিয়ে গান গায়।
তরুণ– তরুণ দলকেই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
আঘাত— ছেলেটি মনে বড়োই আঘাত পেয়েছে।
সজীব- বর্ষার জলে গাছপালা সজীব হয়ে বেড়ে উঠেছে।
আহ্বান– কবি যুবকদলকে দেশের কাছে আহ্বান করেছেন।
মৃত্যু– মৃত্যুকে ভয় পেলে চলবে না।
গান- রবীন্দ্রনাথের লেখা গান রবীন্দ্রসংগীত নামে পরিচিত।
অতি সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন ও উত্তর :
১. ঊর্ধ্বে ও নিম্নে কী হয়ে চলেছে?
উঃ। ঊর্ধ্ব গগনে মাদল বাজছে ও নিম্নে ধরণীতল উতলা হয়ে উঠছে।
২. কোথায় আঘাত হেনে তরুণ দল কী আনবে?
উঃ। উষার দুয়ারে আঘাত হেনে তরুণ দল রাঙা প্রভাত নিয়ে আসবে।
৩. তরুণদল কোন্ গান গেয়ে কী সজীব করার কথা বলেছে?
উঃ। নব নবীনের গান গেয়ে তরুণদল মহাশ্মশানকে সজীব করে তোলার কথা বলেছে।
৪. তরুণদল কী কী দান করবে?
উঃ। তরুণদল নতুন প্রাণ ও বাহুতে নবীন বল দান করবে।
৫. কবি কান পেতে কী শুনতে বলছেন ?
উঃ। কবি কান পেতে মৃত্যুর দুয়ারে জীবনের আহ্বান শুনতে বলছেন।
৬. কবি কী ভাঙতে বলেছেন? উঃ। কবি আগল অর্থাৎ বাধা ভাঙতে বলেছিলেন
৭. 'আমরা টুটাব’—কারা কী টুটাবে?
উঃ। অরুণ প্রভাতের তরুণ দল অন্ধকার রাত টুটাবে অর্থাৎ ঘুচিয়ে দেবে এবং বিন্ধ্যাচলের ন্যায় বাধাও তারা সরিয়ে হবে।
মন্তব্যসমূহ